স্ত্রী-সন্তানদের অবহেলায় বিসিএস ক্যাডার বিজ্ঞানীর মানবেতর জীবন

0
11
বিসিএস ক্যাডার বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফর হোসেন।

বিসিএস ক্যাডার বিজ্ঞানী ড. মোজাফ্ফর হোসেনের শেষ জীবনটা কাটছে অবহেলায়। মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে মানিকগঞ্জের শহরতলির বিলপৌলি গ্রামে একাকী মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। পাশে নেই স্ত্রী ও তার দুই সন্তান।

অভিযোগ রয়েছে, ড. মোজাফ্ফর হোসেনের চাকরি জীবনের অবসরের সব অর্থ আর জমি হাতিয়ে নিয়ে স্ত্রী আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই ছেলে এখন ঢাকায় বসবাস করছেন।

তবে স্ত্রী লিপির দাবি, একজন অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তার দুই সন্তানের জীবন বিপন্ন হতে পারে না? মানসিক ভারসাম্যহীন অবসরপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা স্বামীর দেখভালের জন্য একজন গৃহপরিচারিকা রেখে দেয়া হয়েছে। এ জন্য মাসে তাকে ১০ হাজার টাকা গুনতে হয়। এর চেয়ে তিনি আর কি করতে পারেন?

ড. মোজাফ্ফর হোসেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ছিলেন। বিসিএস ক্যাডার মোজাফ্ফর পিএইচডি করেন রসায়নের ওপর।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মোজাফ্ফর হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার ঘরে বারান্দায় চেয়ারে একাকী বসে আছেন।

এই প্রতিবেদককে দেখে একে একে এগিয়ে আসছেন তার পরিচর্চাকারী রোকেয়া বেগমসহ (সম্পর্কে তার চাচাতো ভাগ্নি হন) তার চাচাতো ভাই আবদুল কুদ্দুস, পাশের বাড়ির অটোরিকশাচালক লেবু মিয়া, প্রতিবেশী স্থানীয় ভূমি অফিসের চাকরিরত জসিম উদ্দিনসহ ১০-১২ জন নারী-পুরুষ।

তারা অভিযোগ করে জানালেন, গত তিন মাস ধরে স্ত্রী-সন্তান কেউ-ই তাকে দেখতে আসেন না। স্ত্রী-সন্তান আর সহায়সম্পদ সবই আছে, কিন্তু ড. মোজাফ্ফর হোসেনের শেষ জীবনটা কাটছে চরম অবহেলা আর অনাদরে। মাঝে মাঝে মানসিক ভারসাম্য ব্যাধি দেখা দিলে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

অথচ ড. মোজাফ্ফরের অবসর জীবনটা কাটানোর কথা ছিল স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসে।

প্রতিবেশী লেবু মিয়া জানান, তিন মাস আগে যখন ড. মোজাফ্ফর হোসেনকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন তিনি ছিলেন কঙ্কালসার একটি মানুষ। পেট পিঠ একাকার ছিল। এখন পরিচর্যায় তার চেহারা কিছুটা পাল্টেছে। ভালোমতো চিকিৎসা করালে তিলি ভালো হয়ে যাবেন এমনটি মনে করছেন তিনি।

প্রতিদিন তাকে সেবাযত্ন করছেন রোকেয়া বেগম। তিনি জানালেন, মানসিক ভারসাম্যহীন তার মামাকে যদি এখনও সঠিক চিকিৎসা করানো হয়, তা হলে অবশ্য তিনি ভালো হয়ে উঠবেন। অসুস্থ ড. মোজাফ্ফর হোসেনের খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, ওষুধ, পথ্যসহ যাবতীয় ব্যয়ের জন্য মাসে ১০ হাজার টাকা করে তার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।

তিনি আরও জানান, মামা (ড. মোজাফ্ফর হোসেন) ফলমূল খেতে বেশি পছন্দ করেন, তিন বেলায় তাকে বিভিন্ন ধরনের ফল দিতে হয়। চিকিসৎক অনেক ওষুধ দিলেও তাকে শুধু খাওয়ানো হয় ট্রিপটিন-২৫ নামে একটি টেবলেট।

ভাগ্নি রেকেয়া বেগম আরও জানান, মামা (মোজাফ্ফর) কাউকে ভালোমতো চিনতে পারেন না। মাঝেমধ্যে দুই-একটি শুদ্ধ বাংলা বললেও বেশিরভাগ কথাই বোঝা যায় না। পায়খানা-প্রস্রাবেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তার।

তিনি বলেন, যখন তিনি বেশি পাগলামি করেন, কোথায় যদি একাকী চলে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এ জন্য তখনই রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

বাড়ির উঠানে কথা হয় মোজাফ্ফরের চাচাতো ভাই আবদুল কুদ্দুস, ভাতিজা আবদুল মান্নান আর প্রতিবেশী লেবু মিয়ার সঙ্গে।

তারা জানান, বিজ্ঞানী মোজাফ্ফর খুবই ভালো মানুষ এবং সৎলোক ছিলেন। ড. মোজাফ্ফরের অনেক সহায়সম্পদ ছিল। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর মোজাফ্ফরের অবসরের (পেনশন) টাকাসহ মানিকগঞ্জের সব সম্পত্তি স্ত্রী আর দুই ছেলে লিখে নিয়েছেন। এখন বিনাচিকিৎসায় তাকে গ্রামের বাড়িতে ফেলে রেখে তারা ঢাকায় বসবাস করছেন। বিছানার অভাবে রাতে মোজাফ্ফরকে মেঝেতেই রাখা হয়।

এ প্রসঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মোজাফ্ফর হোসেনের স্ত্রী লিপি আক্তারের সঙ্গে। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার ও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

তিনি তার স্বামী সম্পর্কে বলেন, তিনি জটিল ‘অ্যালজেইমার’ রোগে আক্রান্ত। ঢাকায় থাকাবস্থায় প্রবিবেশীরা প্রতিদিনই তার স্বামীর অতিমাত্রার পাগলামির বিরুদ্ধে অভিযোগ দিত। যে কারণে তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বামীর সেবাযত্নের জন্য রোকেয়া বেগম নামে এক নারীকে মাসিক বেতনে রেখে দেয়া হয়েছে। স্বামীর খাবার-দাবারসহ যাবতীয় কিছুর জন্য ওই অংকের টাকা তিনি দিচ্ছেন। কম কি? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন ড. মোজাফ্ফর হোসেন। তার রুমমেট ছিলেন মানিকগঞ্জের আইনজীবী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা শাখার সভাপতি আজহারুল ইসলাম আরজু।

অসুস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ওই বৈজ্ঞানিক সম্পর্কে আরজু জানান, প্রগতিশীল মুক্তমনার একজন মানুষ ছিলেন মোজাফ্ফর। অবসরে যাওয়ার পর অনেক টাকা পেয়েছেন তিনি। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর তার স্ত্রী-সন্তানরা তাকে অমানবিকভাবে ফেলে রাখবে এটি কল্পনার বাইরে।

একটা মানুষ দেশের জন্য, জাতির জন্য অবদান রেখেছেন এবং পরিবারের জন্য তো বটেই, তিনি এভাবে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ধুঁকছেন, যা মেনে নেয়া যায় না। তাই বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকে অবগত করার কথা জানান আরজু।

মোজাফ্ফরের বাল্যবন্ধু ডা. সাঈদ-আল মামুন জানান, সম্ভবত মোজাফ্ফর অ্যালজেইমার রোগে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্তদের স্মরণশক্তি কমে যায়। অতীত ও বর্তমানের অভিজ্ঞতা ভুলে যায়। কাউকে চিনতে পারে না। অনেক সময় উত্তেজিত হয়ে বেশিমাত্রায় কথা বলেন।

তিনি বলেন, এভাবে বিনাচিকিৎসায় তাকে নিঃসঙ্গভাবে ফেলে রাখলে অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। তাই তাকে পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া উচিত। পাশাপাশি ভালো নিউরোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে তাকে রাখতে হবে।

এদিকে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ছিলেন ড. মোজাফ্ফর হোসেন। বিসিএস ক্যাডার মোজাফ্ফর পিএইচডি করেন রসায়নের ওপর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। চাকরির শেষ সময় অবস্থাতেই তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ২০১৪ সালে চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন মোজাফ্ফর। পরিবারের পক্ষ থেকে কিছুদিন চিকিৎসা করানো হলেও সুফল মেলেনি। তাই গত জানুয়ারি মাসে তাকে মানিকগঞ্জ শহরের কান্দা পৌলি গ্রামের বাড়িতে রেখে গেছেন স্ত্রী-সন্তানরা।

বান্দুটিয়া গ্রামের মৃত মোকছেদ মোল্লার ছেলে ড. মোজাফ্ফর হোসেনের পূর্বপুরুষ থেকেই সম্পদশালী ছিলেন। গ্রামের সবাই এ বাড়িটিকে মাতবরবাড়ি বলেই এক নামে চেনেন।