বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিৎসা

0
12
বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিৎসা। ছবি সংগৃহীত

পাইলস চিকিৎসায় বহু ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। শতকরা নব্বই জনেরও বেশি রোগীকে বিনা অপারেশনে চিকিৎসা করা সম্ভব। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘রাবার রিং লাইগেশন পদ্ধতি। এরপর রয়েছে ইনজেকশনের পদ্ধতি।

১৯৬৯ সালে জন মরগ্যান চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম ইনজেকশনের সাহায্যে পাইলস চিকিৎসা করেন। তিনি পারসালফেট অব আয়রন ব্যবহার করতেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইনজেকশন পদ্ধতির পাইওনিয়ার হচ্ছেন ডা. মিশেন। কিন্তু তিনি আমৃত্যু তার গোপন ওষুধের ফর্মুলাটি প্রকাশ করে যাননি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তিনি তার গোপন ফর্মুলাটি বিক্রি করে যান। ১৯৭১ সালে শিকাগোর চিকিৎসক ডা. এন্ডুজ প্রথমবারের মতো এই গোপন ফর্মুলাটি প্রকাশ করে বলেন যে, এই ইনজেকশনে ফেনল ব্যবহার করতে হবে। এরপর ফেনলের সঙ্গে গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়।

সতর্কতা : পাইলস ইনজেকশন দেয়ার জন্য একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার করলে তার মাধ্যমে মারাত্মক রোগ ছড়াতে পারে। যেমন হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস যা ধীরে ধীরে লিভার ধ্বংস করে এবং এইডসের মতো ভয়াবহ রোগ ছড়াতে পারে। সিরিঞ্জ জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে অথবা একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।

ইনজেকশনে কী ব্যবহার করা হয় : এখন ফেনলের সঙ্গে ভেজিটেবল অয়েল ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্যে এ জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুইনুরাইড সলুশন ব্যবহার করা হয়। ইনজেকশন দেয়ার সময় রোগীর টের পাওয়ার কথা নয়, ব্যথা পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ইনজেকশনের আগে ও পরে খাওয়া-দাওয়া, পায়খানা করা স্বাভাবিক থাকবে। ইনজেকশনের ফলে মিউকাস ঝিল্লির তলায় পাইলস শক্ত ও সংকুচিত হয়, ফলে পাইলসের ফুলে ওঠা মাংসপিণ্ডটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায় এবং রক্ত পড়া বন্ধ হয়। কোন কোন হাতুড়ে চিকিৎসক পাইলসে ইনজেকশনের নামে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করেন। এটি ব্যবহারের ফলে তীব্র বিষক্রিয়ায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়, মলদ্বারে পচন ধরে, জ্বর আসে এবং দুর্গন্ধ হয়। এঅবস্থায় জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসা না করলে পচন প্রক্রিয়া দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে গিয়ে রোগীর মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। অনেকের পরবর্তী সময়ে মলদ্বার সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে স্বাভাবিক মলত্যাগ করতে পারে না। কখনও কখনও মলদ্বার ও রেকটাম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে পেটে কৃত্রিম মলদ্বার বা কলোষ্টমী করতে হয়।

মলদ্বারের বাইরে ঝুলে পড়ে না এরূপ পাইলসে ইনজেকশন ভালো কাজ করে। যেসব ক্ষেত্রে ইনজেকশন ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষেধ তার মধ্যে রয়েছে- বহিঃস্থির পাইলস, আভ্যন্তরীণ পাইলস যখন সংক্রমিত অথবা থ্রম্বসিস হয়, পাইলসের সঙ্গে যখন ফিস্টুলা, টিউমার বা এনাল ফিশার থাকে।

ইনজেকশন কতবার দিতে হয় : সব পাইলসে একই সঙ্গে ইনজেকশন দেয়া উচিত। এতে যদি রক্ত পড়া বন্ধ না হয় তা হলে অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। অনেক সময় রোগী বলেন যে, আমি প্রতি সপ্তাহে একটি করে মোট সাতটি ইনজেকশন নিয়েছি তবুও কাজ হচ্ছে না। কোথায় নিয়েছেন জিজ্ঞেস করলে বলেন যে, হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে নিয়েছি। বারবার ইনজেকশন দেয়ার জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- মলদ্বারে একটানা জ্বালাপোড়া। ডা. ডেনকার এক গবেষণায় পাইলস চিকিৎসার তিনটি পদ্ধতি যেমন- ইনজেকশন, রিংলাইগেশন ও অপারেশন-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এ সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছেন যে, ইনজেকশন পদ্ধতির সাফল্য নিুমানের। এ কারণে তিনি মনে করেন যে, পাইলস চিকিৎসায় ইনজেকশন পদ্ধতি প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করতে হবে এটা ঠিক নয়। ডা. আলেকজান্ডার উইনিয়ামস দীর্ঘদিন ইনজেকশন ও অন্যান্য পদ্ধতির পাইলস চিকিৎসা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ইনজেকশন পদ্ধতি প্রথম ডিগ্রি পাইলসে স্বল্প মেয়াদে ভালো কাজ দেয়। এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ডা. মারবিন এ করম্যানের মতে প্রথম ডিগ্রি পাইলসেই ইনজেকশন পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত এবং প্রতিটি পাইলসে কেবল একবার ইনজেকশন দেয়াই যথেষ্ট, এরপরও যদি উপসর্গ না কমে তবে বিকল্প কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত।

ইনজেকশন পদ্ধতি শুধু পাইলস চিকিৎসার জন্য। অন্য রোগে সম্পূর্ণ নিষেধ। ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারে সতর্কতার প্রয়োজন। একবার ইনজেকশন দিয়ে ভালো না হলে বারবার ইনজেকশন দিয়ে অধিক সুফল পাওয়া যায় না বলে রেকটাম ও মলদ্বার সার্জারি বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

লেখক : কলোরেক্টাল সার্জন, ইন্টারন্যাশনাল স্কলার