ছবির রবীন্দ্রনাথ।

0
59

“ছবি হল আমার শেষ জীবনের প্রিয়া, তাই নেশার মত আমাকে পেয়ে বসেছে” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবি সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরে গিয়েও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা পরিচয় আছে তা হল ছবির রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ শিল্পী রবীন্দ্রনাথ।

ছবির সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল ছেলেবেলায়। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই লিখেছেন -“স্কুল হইতে ফিরিয়া আসিলে ড্রাইং এবং জিম্নাস্টিকের মাস্টার আমাদিগকে লইয়া পড়িতেন।” -(নানা বিদ্যার আয়োজন) । আবার লিখেছেন -” জিম্নাস্টিকের মাস্টার এসেছেন। কাঠের ডান্ডার উপর ঘন্টাখানেক ধরে শরীরটাকে উলটপালট করি। তিনি যেতে না যেতেই এসে পড়েন ছবি আঁকার মাস্টার। ” – ( ছেলেবেলা)। এরপর ছবির সঙ্গে কবির যোগাযোগ কোথাও একটা ম্লান পড়ে যায়। পুনরায় এই যোগাযোগ শুরু হয় ১৯২৪ সালে।তখন থেকে তিনি তুলির কাজ বা কলমের মুখ দিয়ে রেখাঙ্কন শুরু করেন। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ বাসকালে রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা আরম্ভ করেছিলেন। ছোট-বড় নানান আকারের প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকেছেন তিনি। যার মধ্যে ১৫০০+ ছবি বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতনে সংগৃহীত আছে। মাত্র ১৬ বছরে অজস্র কর্মজালে বিজড়িত ও চিন্তায় ভাবগ্রস্থ একটি প্রবীণ মানুষের পক্ষে বারবার স্বাস্থ্য ভঙ্গের বিরম্বনার মধ্যে এতগুলো ছবি আঁকা সহজ ব্যাপার নয়। ১৯৩০সালে ১২৫টি ছবি নিয়ে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয় এবং পরবর্তীতে তা লন্ডন, বার্লিন,মস্কো, নিউইয়র্কে হয়। যেখানে তিনি শিল্পী নামে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। যার কারণ ছিল তার ব্যতিক্রমধর্মী ছবি। ইউরোপে তখন আধুনিক আর্টের চর্চা। আধুনিক আর্ট এর গোড়ার কথা হল গতানুগতিক চিত্রাঙ্কনের পদ্ধতির বিরুদ্ধে এবং বাস্তবের হুবহু অনুকরণের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সত্যের উপরে গিয়ে আরো সত্যকে ধরা। রবীন্দ্রনাথ ও একই কথা বলেছেন -” জগতে দু’রকমের সত্য আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছে আরও সত্য। আমার কারবার আরো সত্য নিয়ে।” কিন্তু তখনো ভারতে রবীন্দ্রনাথ কে শিল্পী হিসাবে মর্যাদা দেয়নি এবং আমাদের সাধারণের চোখে হয়তো এখনও, ‘এ আর এমন কী এঁকেছে’ ধরনের বা বুড়ো বয়সের পাগলামি মনে হতে পারে। এমন অবস্থায় শিল্পী লিখেছিলেন – ” লোকে অনেক সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমার ছবির অর্থ কী ? আমি চুপ করে থাকি যেমন চুপ করে থাকে আমার ছবি। ছবির কাজ শুধু ফুটে ওঠা, যা প্রকাশ্য ছিল না তা প্রকাশ করা – তার অস্তিত্ব তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা নয়।”

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে অজন্তা, মুঘল,রাজপুত, কাংড়া, ব্রিটিশ প্রভৃতির সঙ্গে কোনো মিল নেই। তিনি ছিলেন ব্যাকরণ জ্ঞান শূন্য। হাতে কলমের ছবি আঁকার কোন শিক্ষা ছিল না বলে তার ছবি স্বাধীন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলে ছবিতে তার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে। শিল্পী অনেক চেষ্টা করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বেড়া ভাঙতে পারে ঠিকই কিন্তু সেই বেড়া ভাঙ্গার মধ্যেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংস্করনের ছাপ থাকে। তাই দূর্বলতাই ছিল তার স্বাধীন ছবি আঁকার আধার । যেমন খুশি হাত চালিয়ে গড়ে তুলেছিলেন অবয়ব, বস্তু, জন্তু, নিসর্গ চিত্র। কিন্তু তবুও বলাবাহুল্য রবীন্দ্রনাথের কাজে বিংশ শতাব্দীর শিল্প আনদোলন এক্সপ্রেশনিজমের সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ন ভাব আছে। অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট হিসাবেও তার ছবিকে অনেক শিল্প-সমালোচক ব্যাখ্যা করে থাকেন।
ছবি ছিল তার কাছে অনেকটাই ছড়ার মত। ছড়ার জগতকে এক হিসেবে বলা যায় ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট ‘। কথার ফ্রেমে বাঁধলেও তার অনেকটাই থাকে বাইরের কথা। রবীন্দ্রনাথ, তার মনের অচেতন স্তর যা দিয়ে পরিপূর্ণ, তাই আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন।
তাঁর ছবিতে আলোছায়ার প্রয়োগ ছিলনা সেভাবে। ছবিগুলো ছিল যেন তৃতীয় নয়নে দেখা, যার আংশিক তিনি মনে করতে পারছেন আর বাকিটা তিনি ভুলে বসেছেন। রঙ নির্ধারণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ছিল অন্ধকার। তার ছবিতে কালো রঙের ছড়াছড়ি। এছাড়াও কিছু রঙ তিনি ব্যবহার করতেন কিন্তু বলা বাহুল্য গুটিকয়েক রং বারবারই ঘুরেফিরে এসেছে তার ছবিতে। যেমন, হলুদ, সোনালী হলুদ, শিশি-সবুজ, লাল, হালকা নীল ইত্যাদি রং।যেন অন্ধকারের সামনে নানা রংয়ের চলাফেরার অদ্ভুত ভাবে নাটকীয়তা সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে মানুষ জীবজন্তু প্রভৃতির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রূপবিকৃতি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। শূন্যস্থান কে কাজে লাগিয়ে ছবিতে ভারসাম্য তৈরিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সব মিলিয়ে বলা যায়, তিনি শুধু রূপাতীত সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রয়াস করেছেন। তার ভাষায় ” সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর “৷

জীবনের পঞ্চম অঙ্কে এসে কবি আঁকতে শুরু করেছিলেন।”পূরবী “-র পান্ডুলিপি ছিল সেই শুরু। কবিতার খাতার কাটাকুটি খেলা যে কি করে ছবি হতে শুরু করল তা বলা অসাধ্য। তাই হয়ত বলা হয় ভাস্কর রঁদ্যা খেলার ছলে শিব গড়েন আর আমরা হাজার চেষ্টা করে বাঁদর গড়ি। রবীন্দ্রনাথের এই খেলার ছলে ছবিগুলো হয়ে থাকল শিল্প জগতের একটি বড় ভান্ডার।ঈশ্বরের বরপুত্র পেলেন আরো একটি মুকুট।

সুইলিন হক
অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগ,
বি. এফ.এ (সম্মান)
চারুকলা অনুষদ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়